Sunday, 24 October 2021

সময়ের দৌড়ে মানবতার অবক্ষয় - রীতা রায়


পৃথিবী ছুটছিল  .. দিন থেকে সন্ধ্যা ..
সন্ধ্যা থেকে রাত ..রাত পেরিয়ে আবার সকাল | পৃথিবীর ঘূর্ণনের মাত্রা অনুসরণ করে মানুষও ছুটছিল কারন তারা এতদিনে জেনে গেছে নিজেদের অস্তিত্বের লড়ায়ে এগিয়ে থাকতে হলে ছুটতেই হবে | এই ছোটার নেশা ক্রমে এতটাই প্রবল হয়ে পড়লো যে ক্রমশঃ তারা ভুলতে বসলো তাদের সীমা | সামনে যত বাধা নিমেষে বিলুপ্ত করতেও তাদের দ্বিধা বোধ হলোনা | ফলে প্রকৃতির নিয়মের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ালো তাদের আকাঙ্ক্ষা | একাংশ  মানুষ যখন উদগ্রীব হয়ে প্রায় ছুঁয়ে ফেলছে আকাশটাকে  ..আর একদল মানুষ তখন পিছিয়ে পড়তে লাগলো | এই রেষারেষীর নাম দিল 'ইঁদুর দৌড়' | কিন্তু ইঁদুরেরা কখনো নিজেরা নিজেদের প্রজাতিকে বিনষ্ট করতে একে ওপরের সাথে বিরোধিতা করেনা | তবু, বদনামটা  তাদের নামেই ব্যবহার হলো | আবার মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচারের নামে ব্যবহৃত বিশেষণ 'পাশবিকতা' | পশু কিংবা পাখি তারা কি নিজেদের মধ্যে খাদ্য বা অধিকার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে ? একটি কাক কোথাও খাবারের সন্ধান পেলে কা কা রবে অন্য কাকেদের জানান দিয়ে তারপর খাবারে মুখ দেয় | কুকুরের দল একসাথে খাবার ভাগ করে খায় | বাঘ সিংহের মতো হিংস্র প্রাণীও একটি শিকার নিজের পেট ভরার পর অন্যদের জন্য ছেড়ে দেয় | ক্ষুদ্র জীব পিপীলিকা বা মৌমাছি কিংবা পঙ্গপাল .. এরা কি কখনো দলছাড়া থাকতে পারে ? মানুষও সমাজবদ্ধ জীব। একে অপরের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা সত্বেও নিজেদের অধিকার ও আর্থিক স্বচ্ছলতার কারনে মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি | নিজেদের প্রতিপত্তি বা প্রাধান্য বিস্তারের জন্য পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণী ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট করতেও দ্বিধাবোধ করে না তারা |
তা সত্বেও তাদের নামের বিশেষণে 'মানবিক' শব্দটি ব্যবহার হয়ে আসছে | মানবিক বললেই সুস্থ সুন্দর সচেতন অনুভূতি চোখের সামনে ফুটে ওঠে .. আবার পাশবিক বললে একটা হিংস্র দুরাচার অত্যাচার .. এগুলোই বোঝানো হয় | কিন্তু পশুরা কী সবসময় হিংস্র ? তারা নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচাতে কখনো কখনো হিংস্র হয়ে ওঠে | কিন্তু মানুষ তার লোভের বশে হিংস্র হয়ে ওঠে ..পরিচয় দেয় অমানবিকতার | মানবিকতার জন্য শিক্ষার প্রয়োজন হয় না .. প্রয়োজন অনুভূতির , ভালোবাসার |
মানুষ দিন দিন ভুলতে বসেছে তাদের স্বকীয়তা | প্রতিনিয়ত হয়ে চলেছে মানবতার অবক্ষয়। আবার রাজনীতি ও সাম্প্রদায়িকতা মানুষে মানুষে নতুনভাবে বিভেদ সৃষ্টি করছে। 'মনুষত্ব' শব্দের অর্থ আজ বিলীন। ধর্মের অর্থও আজ বদলে গেছে। ধর্ম শব্দের অর্থ ন্যায় , আর অধর্ম শব্দের অর্থ অন্যায়। আধুনিকযুগে এসে অনেকগুলো ধর্মগুরু সৃষ্টি হওয়ার ফলে প্রত্যেকে নিজ নিজ তৈরী নিয়মকে ন্যায়ধর্ম ও অন্যান্যদের নিয়মকে অন্যায়ধর্ম মনে করতে লাগলো আর তখনি 'ধর্ম' শব্দটা বিভেদ সৃষ্টি করলো মানুষে মানুষে। কিন্তু এ ধারণা ভুল। মানুষের ধর্ম 'মনুষ্যত্ব'। মানবিক ধর্ম অবলম্বনই একমাত্র উপায় সুস্থ ও স্বাভাবিক পৃথিবী গড়ে তোলার। আর এভাবেই মানবতার অবক্ষয় রোধ করা সম্ভব।
------===-------===-------===-----

মানবতাই সুখে থাকার মূল কারণ - রতন বসাক



বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে এই পৃথিবীতেই একমাত্র জীবের বাস। অন্যান্য পশু পাখিদের মতোই মানুষ একসময় জীবনযাপন করতো। তবে মানুষ হলো জ্ঞানে, গুণে, বুদ্ধিতে সমস্ত জীবের থেকে সেরা। কর্মগুণ ও ইচ্ছাশক্তির বলে মানুষ তাঁর জীবন সবার থেকে সুখের করে নিয়েছে। আর জীবন পথে আরও এগিয়ে যাবার জন্য, একের পর এক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

এই পৃথিবীতে কারো পক্ষেই একা বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই মানুষ প্রথমে সমাজ তারপর দেশ, গড়ে নিয়ে সবাই মিলেমিশে বসবাস করে চলেছে। আমরা প্রত্যেকে প্রত্যেকের জন্য এটা আমাদের মনে রাখতে হবে। সবাই সব কাজ সমান ভাবে করতে পারে না। তাই আমাকে অন্যের ও অন্যকে আমার প্রয়োজন আছে, বেঁচে থাকতে গেলে। মানবতা, প্রেম, প্রীতি ও ভালোবাসাই হলো সহাবস্থানের মূল ধন।

তবে কিছু কাল হলো দেখা যাচ্ছে যে, অল্প কিছু মানুষ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। দুষ্কৃতীমূলক আচরণ করে চলেছে। বিশেষত রাজনৈতিক ও ধার্মিক কারণেই মানুষ তার নিজের মানবতা ভুলছে। ভালোবাসা ভুলে অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। পুরোটা না জেনে বুঝেই অন্যের ক্ষতি করতে একবারও ভেবে দেখছে না। অন্যের প্ররোচনায় নিজের মনুষ্যত্বকে ভুলে গিয়ে তারা অন্যায় কাজ করতে যাচ্ছে।  

সামান্য কিছু কারণেই উত্তপ্ত হয়ে অন্যের ধন সম্পদ ধ্বংস করছে; এমনকি জীবন হানিও করছে এইসব কিছু ক্ষুদ্রমনা মানুষ। যদিও আমি এদের মানুষের পর্যায়ে মনে করি না । কেননা এরা মান ও হুঁশ ভুলে বসে আছে। কোন কাজটা করা ন্যায় আর কোন কাজটা করা অন্যায়, এরা একবারও ভেবে দেখে না। অন্যের প্ররোচনায় কিংবা সামান্য কিছু লাভের আশায় এরা এইসব অপকর্ম করে থাকে।

পৃথিবী কিংবা একটা দেশের প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে মানবতা নেই, এটা আমি মানতে পারি না। সবাই যেমন খারাপ হতে পারে না, আবার সবাই ভালোও হতে পারে না। ভালো আর খারাপ মানুষ নিয়েই আমাদের সমাজে বাস করতে হয়। প্রত্যেকটি ভালো মানুষের কর্তব্য হলো, খারাপ মানুষকে ভালো করে বুঝিয়ে তাঁদের ভালো করে তোলা। কেউ জন্ম থেকেই খারাপ হয় না। বিভিন্ন কারণে ও পরিস্থিতিতে পড়ে সে খারাপ হতে বাধ্য হয়।

একজন ভালো মানুষ ও অমানবতার পরিচয় দিলে কেমন করে চলবে এই সমাজে? কাউকেই নিজের হাতে শাসনভার তুলে নিয়ে শাস্তি দেওয়াটা উচিত নয়। এর জন্য প্রত্যেকটি দেশেই প্রশাসন বিভাগ আছে। কোনো অন্যায় হলে তার অভিযোগ করে বিচার পাওয়ার আশা রাখতেই পারে। এই পৃথিবীর প্রত্যেকটি জীবের প্রতি আমাদের মানবতা দেখাতে হবে। আর তা না হলে অমানবিকতায় আগামীতে জীবের ধ্বংসের সম্মুখীন হতেই হবে।

এই বঙ্গ দ্বেষ - সুব্রত মিত্র


এই বঙ্গে অনেক বুদ্ধিজীবীদের দেখতে পাই।
এই বঙ্গে অনেক মহাকবিদের দেখতে পাই।
এই বঙ্গে অনেক সম্প্রীতির বার্তা বাহককে দেখতে পাই।
এই বঙ্গে রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে কথা বলার মত-- অনেক মুখরোচক নেতাদের দেখতে পাই।
যা দেখেছি সব ভুয়ো বাতাস, সব নিঃস্বতায় পোড়া এক রত্তি ছাই।

এই বঙ্গে অন্যায়ের প্রাতিবাদ না করে শুধু সম্মান হারানোর ভয়ে-----
লেজ গুঁটিয়ে পালানোর মত অনেক মহাপুরুষদের দেখতে পাই।
আমি খুব ছোটখাটো মানুষ অথচ আমি মস্ত বড় ছোটলোক হয়েও------
উনাদের দেখে বড় কষ্ট পাই ,ওনাদের দেখে বড় লজ্জা পাই।

এই বঙ্গে ঝুলিয়ে সম্প্রীতির মালা
শালারা মা-বোনের ইজ্জত বেচে দেয়---
তারাই আবার দেশপ্রেমের উন্মুক্ত চেতনার ভাষণে মঞ্চ আওড়ায়।
এই বঙ্গে ঐ কান্ডারীর দল কেড়ে নেয় ইমোশন; ফাঁটকাবাজের শক্তিমান হয়ে পকেটে ভরে প্রমোশন,
সম্প্রীতির নামে নিজের স্বার্থে এখানে-----
ভেসে যায় আমার মা-বোনের সম্ভ্রম।

এই বঙ্গে ভাইয়ে-ভাইয়ে, বাবা-কাকায় হয়ে যায় কত হানাহানি
এই বঙ্গেই আমি দেখি; সব জেনেশুনেও জনস্বার্থে নেতারা করেনা কানাকানি,
শুধু বলে; "সম্প্রীতি, সম্প্রীতি, সম্প্রীতি"।
আমি যদি বলি ওহে নেতা, কেন হচ্ছে তবে সমাজের এত অবনতি?

স্বাধীনতার এত বছর পরেও এই বঙ্গের হয়েছে কি সংস্কার?
চারিদিকে হিংসার দুর্বার, এই বঙ্গ ঐ বঙ্গ ভেঙে হচ্ছে ছারখার
কি প্রয়োজন হয়েছিল ওদের আজ হিন্দুদের ঘরবাড়ি; মন্দির পোড়াবার?

তোমরা নাকি মুসলমান;
তোমাদেরওতো ধর্মের আছে অনেক মান সম্মান
তবে কেন অন্য ধর্মের ক্ষতি করে নিজের ধর্মকে করো অপমান?
আমি বিগ্রহ চিত্তে মালা ছিড়ে ফেলি সব নেতাদের সব রাজনৈতিক দলের------------------
সব হিংস্রতার; সব নোংরা মানসিকতার।

আর যে সকল কবি সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা------
বুদ্ধির ঢেঁকি মাথায় নিয়ে চুপটি করে তামাশা দেখে--
তোমাদের আক্কেল হওয়া চাই, 
তোমাদেরও আছে মা বোন, আছে ভাই।

তবে আজ তোমাদের কলম কোথায়?

হে কবি, হে বুদ্ধির ঢেঁকিওয়ালা বুদ্ধিজীবী .. ....  ...  ..
তোমাদের মানবিকতাও বিক্রি হয়েছে নাকি ঐ নেতাদের গোপন পকেটে?
নাকি তোমার ধর্মটাও বিক্রি হয়ে গেছে স্বার্থের হাটে?
তুমি জানো কি ?আমাদের জাতিটাও আজ ভেসে যেতে বসেছে সস্তার ঘাটে।

শুনে রাখ, শুনে রাখ, শুনে রাখ সকল বুদ্ধিজীবীগণ.......
সকল জাতির জাতীয়তাবাদ, সকল ধর্মের ধর্ম প্রবাদ
সকল দেশের দেশাত্বতা, সকল মনের মহানুভবতা
সকল মনের কামনা-বাসনায়; স্পর্শতা থাকুক স্বাধীনতায়।

আমাদের দুই বঙ্গের আপন সিন্ধু সেই তো মোদের বঙ্গবন্ধু
তারেই বলি মোরা জাতির জনক,
সেতো আজ হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি মোদের অহংকারের মাইলফলক।
সে যে শিখিয়ে গেছেন একই ভাষায় দুই বঙ্গের আলিঙ্গন
শিখিয়েছেন ভালবাসতে; শিখিয়েছেন কাছে আসা আসি
সেই তো মোদের রবীন্দ্রনাথের কন্ঠকে জাতীয় সংগীতে স্থাপন করেছেন--
"আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি"।

জাগো; জাগো; জাগো;.. ..    ... জাগো মহাবীর
এই বঙ্গমাতার নিঃস্ব খাতায়-------
রাখিবো আবার অটুট ছবি আমার বঙ্গের সংস্কৃতির।

লজ্জা - গৌতম নায়েক

  


বাহ রে ধর্ম! বকধার্মিকদের কি দারুন দেয় শিক্ষা
অসহায়ের প্রতি নৃশংস হয়, দেয় না সমব্যথা ভিক্ষা।

অসহিষ্ণুতার শিক্ষা দেয় কেবলই যে ধর্ম
হানাহানি ছাড়া গুরুর যে ধর্মে নেই কর্ম
জালিয়াতি হয় যে ধর্মে ধর্মগুরুর মূলধন
হিংসাকে যে ধর্ম করতে পারে না বর্জন
গুরুর ফাঁদে পা দিয়ে যে ধর্ম ছড়ায় সন্ত্রাস
সে ধর্মে কি আছে বাঁচার মুক্ত বাতাস?

যে ধর্ম করতে শেখায় মানবতার ধ্বংস
সে ধর্ম আদৌ কি উপর ওয়ালার অংশ?
হত্যালীলা চালাতে যেথা চলে ঘুঁটির সজ্জা
তেমন ধর্ম মানবতার চরমতম লজ্জা।
উস্কানিতে যে ধর্ম গড়ে সিঁড়ি স্বর্গে যাবার
মানুষকে যে সম্মান দেয় না, তাকে জানাই ধিক্কার!
                   ----------------

নিহত বিবেক - অভিজিৎ ব্যানার্জী



এই বেশ আছি,
বলতে পারি না, ডুঁকরে কাঁদে মন,
আশার ছলনায়, ছুটে যাই দ্বারে
দেখি দাঁড়ায়ে শমন!

যাহা কিছু চাই, ভুল করে চাই,
যেটা হাতে পাই, পরে দেখি ছাই,
অন্তর জ্বালা ,মেটায় কোথায়?
খুঁজে চলে ক্ষ্যাপা মন।

সুখের আশায় বানিয়েছি বাড়ি,
স্বার্থ জানালা খোলা,
দুঃখের সাথে দিতে চাই আড়ি
দৃষ্টিশক্তি হয়ে আসে ঘোলা!

তবু হেঁটে চলি, অভিসার পথে
সৌভাগ্যের ,কোন আশার রথে
যদি হয় কভু ঠাঁই,
দেখি পথে পড়ে, বিবেকের মৃত লাশ
প্রেম ভালোবাসা করে হা-হুতাশ
আশা আকাঙ্ক্ষা পুড়ে হলো ছাই!