Friday, 28 August 2026

পরবর্তী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ বনাম জল নিরাপত্তা --- ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়


কলের মাধ্যমে পাওয়া, জলাধারে পূর্ণ  কিংবা বর্ষাকালে নিয়মিতভাবে প্রাপ্ত  জলকে উপেক্ষা করা সহজ। অথচ এই আপাত প্রাচুর্যের আড়ালেই লুকিয়ে আছে একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক চ্যালেঞ্জ:" জল নিরাপত্তা"। পরবর্তী প্রজন্ম এমন এক পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হতে যাচ্ছে যেখানে মিষ্টি জলের জন্য প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর কারণ হিসেবে কাজ করছে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা , শহরের বিস্তার, কৃষিকাজে জলের বাড়তি চাহিদা, শিল্পখাতে বিপুল পরিমাণ জলের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন।সম্মিলিত ভাবে এগুলো এমন সব ব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে যা আগামী দিন নির্ধারণ করবে কোথায় ও কখন জল পাওয়া যাবে।

এই কারণেই জল নিরাপত্তা কেবল একটি পরিবেশগত বিষয়-এর গণ্ডি ছাড়িয়ে অনেক বড় কিছু হয়ে উঠবে আগামী তে। এটি ক্রমশ খাদ্যমূল্য, জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি উৎপাদন, অভিবাসন, নগর উন্নয়ন,  এমনকি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করবে।
প্রশ্নটি এখন আর কেবল এটি নয়,  পৃথিবীতে পর্যাপ্ত জল আছে কি না,  বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটাই,  সমাজব্যবস্থার প্যারামিটারগুলো কি এমন নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম যে—মানুষ, বাস্তুতন্ত্র, কৃষি ও অর্থনীতি—প্রয়োজনের সময় নিরাপদ জলের নির্ভরযোগ্য প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে পারবে?

ধীরে ধীরে জল একটি কৌশলগত সম্পদে পরিণত হচ্ছে। মিঠা জল সীমিত ও অসমভাবে বণ্টিত।  এটি প্রতিনিয়ত জলচক্রের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এক জায়গায় বৃষ্টিপাত হলে , নদীগুলো সীমানা অতিক্রম করে বয়ে চলে, বিভিন্ন জনবসতির নিচে ভূগর্ভস্থ জল জমা হয় এবং অঞ্চলভেদে জলের চাহিদার মধ্যে ব্যাপক তারতম্য দেখা যায়। এই পরিস্থিতি, এক জটিল বাস্তবতার জন্ম দেয়। প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়া সত্ত্বেও কোনো দেশ জল-নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে পারে। কোনো শহর হয়তো বিশাল কোনো নদীর তীরে অবস্থিত, তবুও নিরাপদ খাবার জল সরবরাহের ক্ষেত্রে তাকে হিমশিম খেতে হতে পারে। কোনো অঞ্চলে হয়তো ভূগর্ভস্থ জলের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে, অথচ সেখানকার সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সেই জলের নাগাল পায় না।

তাই জলের নিরাপত্তা কেবল এর প্রাকৃতিক সহজলভ্যতার ওপর নির্ভর করে না বরং অবকাঠামোগত বিষয় টি  ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ এবং সুশাসন ও সুব্যবস্থাপনাও জরুরি। 
দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জল সংরক্ষণের সক্ষমতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা—এসবও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশাপাশি, জলাধার-অববাহিকা, জলাভূমি, নদী ও ভূগর্ভস্থ জল ব্যবস্থাকে অবক্ষয়ের হাত থেকে রক্ষা করার সক্ষমতাও সমানভাবে জরুরি। আগামী প্রজন্মের কাছে এই বিষয়টি ক্রমশ আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
জলবায়ু পরিবর্তন জলচক্রকে নতুন করে সাজাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মূলত জলেরই একটি গল্প। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল অধিক পরিমাণে জলীয় বাষ্প ধরে রাখতে পারে, যা বৃষ্টিপাতের তীব্রতা ও বণ্টনের ওপর প্রভাব ফেলে। একই সাথে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বাষ্পীভবন বেড়ে যায় এবং ফলস্বরূপ  মাটি, উদ্ভিদকুল, জলাধার ও মিঠা জলে উৎসের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হয়।

এর ফলে পৃথিবী কেবল যে আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে, তা নয়। বরং পৃথিবী হয়ে উঠছে জলবায়ুর দিক থেকে আরও অনিশ্চিত ও জল-কেন্দ্রিক। কিছু অঞ্চলে ক্রমশ তীব্র খরা দেখা দিচ্ছে, আবার অন্য কোথাও আঘাত হানছে ধ্বংসাত্মক বন্যা। প্রাকৃতিকভাবে জল ধরে রাখা ও তা ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে যে হিমবাহ ও তুষার-ব্যবস্থা ভূমিকা রাখে, তাতে পরিবর্তন আসছে। অনেক এলাকায় বৃষ্টিপাতের ধরন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় কৃষি মৌসুম ও জলের প্রাপ্যতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলো আর নির্ভরযোগ্য থাকছে না। এর ফলে এক বিপজ্জনক বৈপরীত্য তৈরি হচ্ছে: কোথাও জলের অত্যধিক আধিক্য, আবার কোথাও তীব্র ঘাটতি। বন্যার ফলে পানীয় জলের ব্যবস্থা দূষিত হতে পারে, অবকাঠামো ধ্বংস হতে পারে এবং জনবসতি স্থানচ্যুত হতে পারে। অন্যদিকে, খরার কারণে কৃষি উৎপাদন হ্রাস পেতে পারে, জলাধারগুলো শুকিয়ে যেতে পারে এবং সীমিত সম্পদের জন্য প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠতে পারে।

উভয় চরম পরিস্থিতির ফলেই বিশাল অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্যও দিতে হতে পারে। জল-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে কৃষি । জল নিরাপত্তার গুরুত্ব কৃষির চেয়ে স্পষ্টভাবে আর খুব কম ক্ষেত্রেই পরিলক্ষিত হয়। খাদ্য উৎপাদন নির্ভর করে জলের নিরবচ্ছিন্ন ও নিশ্চিত প্রাপ্তির ওপর। ফসলের জন্য প্রয়োজন বৃষ্টিপাত কিংবা সেচব্যবস্থা। গবাদি পশুর জন্যও জলের প্রয়োজন। এছাড়া খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণেও প্রচুর পরিমাণে মিঠা জলের ব্যবহার হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের ফলে খাদ্যের চাহিদা জল সম্পদের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করতে থাকবে। সমস্যা হলো, জলবায়ুর পরিবর্তনশীলতার কাছে কৃষিক্ষেত্র অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

দীর্ঘস্থায়ী খরা ফসল ধ্বংস করতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত উর্বর মাটি ধুয়ে নিয়ে যেতে পারে এবং কৃষিজমির ক্ষতি করতে পারে। বৃষ্টিপাতের সময়ের পরিবর্তন ফসল রোপণ ও সংগ্রহের মৌসুমকে ব্যাহত করতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি ফসলের জন্য জলের প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দিতে পারে। এর অর্থ হলো, জলের সংকট দ্রুত খাদ্য সংকটে রূপ নিতে পারে। যেসব দেশ কৃষির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে, গ্রামীণ আয় হ্রাস পেতে পারে এবং খাদ্য আমদানির জন্য সরকারের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই খাদ্য নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ জল ব্যবস্থাপনার ভবিষ্যতের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।

শহরগুলো ও জল-ব্যবস্থাপনার এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে। নগরায়ণ এই সমস্যাটিকে আরও জটিল করে তুলছে। মানুষের শহরমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। শহরের বিপুল জনসংখ্যার জন্য গৃহস্থালি কাজ, পয়ঃনিষ্কাশন, নির্মাণকাজ, উৎপাদন শিল্প, খাদ্য পরিষেবা এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম—সব মিলিয়ে প্রচুর পরিমাণে জলের প্রয়োজন । তবে শহরগুলো কেবল জল ব্যবহারই করছে না, বরং জলপ্রবাহের স্বাভাবিক পথ ও ভূ-প্রকৃতিকেও বদলে দিচ্ছে। প্রাকৃতিক ভূপৃষ্ঠের জায়গায় যখন কংক্রিট ও পিচের আস্তরণ তৈরি হয়, তখন বৃষ্টির জলের মাটির গভীরে প্রবেশ করার সুযোগ কমে যায়। এর ফলে বৃষ্টির জল শহরের উপরিভাগ দিয়ে দ্রুত প্রবাহিত হয়, যা একদিকে যেমন বন্যার ঝুঁকি বাড়ায়, অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ জলস্তর পুনর্ভরণের (recharge) প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে।
একই সাথে, দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণযুক্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য জল শোধন এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণ নদী ও ভূগর্ভস্থ জলকে দূষিত করতে পারে। এর ফলে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের সৃষ্টি হয়। একটি শহর হয়তো কোনো ঝড়ের সময় ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে, অথচ কয়েক মাস পরেই তীব্র জল সংকটের সম্মুখীন হয়। এর সমাধানে শহরগুলোকে জল ব্যবস্থাপনার বিষয়টি নতুন করে ভাবতে হবে; অর্থাৎ পানীয় জল, বর্জ্য জল, নিষ্কাশন ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ জল এবং বৃষ্টির জলকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে না দেখে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন ।

আফ্রিকা জল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই আফ্রিকার জলের ভবিষ্যৎ বিশেষ মনোযোগের দাবি রাখে। এই মহাদেশে প্রচুর পরিমাণে মিঠা জলের উৎস রয়েছে, কিন্তু তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য বিদ্যমান। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, অবকাঠামোগত ঘাটতি, দূষণ, কৃষির ওপর নির্ভরশীলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তন—এসব বিষয় জলের ক্ষেত্রে ক্রমশ জটিল সব চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অনেক জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সমস্যাটি কেবল জলের অভাব নয়; বরং সমস্যাটি হলো এমন নির্ভরযোগ্য অবকাঠামোর অভাব, যা দিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে নিরাপদ জল সরবরাহ করা সম্ভব। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো জনবসতির কাছে নদী থাকা সত্ত্বেও সেখানকার পরিবারগুলোকে হয়তো পানীয় জলের জন্য হিমশিম খেতে হয়। মাটির নিচে ভূগর্ভস্থ জল মজুদ থাকলেও তা উত্তোলন ও বিতরণের প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে মানুষ তা ব্যবহার করতে পারে না। এরই মধ্যে, জলবায়ু পরিবর্তন আগে থেকেই নাজুক অবস্থায় থাকা এসব ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। তাই আফ্রিকার ক্ষেত্রে, জল-নিরাপত্তাকে কেবল পরিবেশগত নীতির বিষয় হিসেবে না দেখে বরং উন্নয়নের একটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। জল-ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অবকাঠামোয় বিনিয়োগ জনস্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে, কৃষিখাতকে শক্তিশালী করতে পারে, শিল্পখাতকে সহায়তা করতে পারে, জলবায়ুজনিত অভিঘাতের ঝুঁকি কমাতে পারে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে। জল-নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পেছনে অত্যন্ত জোরালো অর্থনৈতিক যুক্তি রয়েছে।

দূষণ প্রাচুর্যকে দুষ্প্রাপ্যতায় পরিণত করতে পারে জলের  অভাব। সবসময় যে জলের স্বল্পতার কারণেই এমন ঘটে, তা নয়, কখনও কখনও, সহজলভ্য জলকে ব্যবহারের অযোগ্য করে ফেলার ফলেও এই সংকট তৈরি হয়। শিল্পকারখানার দূষণ, কৃষি-নিঃসৃত বর্জ্য মিশ্রিত জল, অপরিশোধিত বর্জ্য জল, প্লাস্টিক, তেল দূষণ এবং অন্যান্য দূষক পদার্থ, মিঠা জলে বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে এবং মানুষের ব্যবহারের উপযোগী জলের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। এটি বিশেষ করে বিপজ্জনক কারণ দূষণ একটি 'ফিডব্যাক লুপ' বা চক্রাকার প্রভাব তৈরি করতে পারে। দূষিত জলের সমস্যার সম্মুখীন জনগোষ্ঠী বিকল্প উৎসের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে, যার ফলে ভূগর্ভস্থ জল বা দূরবর্তী জলের উৎসের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়। এছাড়া দূষিত নদী মৎস্যসম্পদ, কৃষি এবং এমন সব বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে যার ওপর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্ভরশীল।

তাই জলের পরিমাণ বাড়ানোর মতোই জলের গুণমান রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দূষিত নদী কোনো কার্যকর জলসম্পদ নয়।অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ জল হলো এক অদৃশ্য সুরক্ষা-বলয়। জল নিরাপত্তার অন্যতম একটি উপেক্ষিত দিক লুকিয়ে আছে আমাদের পায়ের নিচে। ভূগর্ভস্থ জল বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জলের চাহিদা মেটায় এবং কৃষি, বাস্তুতন্ত্র ও শিল্পখাতকে সচল রাখে। অনেক অঞ্চলে অপর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের সময় এটি একটি রক্ষাকবচ বা ‘বাফার’ হিসেবে কাজ করে। কিন্তু ভূগর্ভস্থ জল কোনো অফুরন্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নয়।

দীর্ঘ সময় ধরে প্রাকৃতিক পুনর্ভরণের (natural recharge) তুলনায় ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলনের পরিমাণ বেশি হলে জলের স্তর নিচে নেমে যেতে পারে। 
উপকূলীয় এলাকায় অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে লোনা জল ঢুকে পড়ার (saltwater intrusion) ঝুঁকিও তৈরি হয়। সমস্যাটি বিশেষ জটিল হওয়ার কারণ হলো, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর কমে যাওয়ার বিষয়টি দীর্ঘ সময় ধরে অনেকটা চোখের আড়ালেই থেকে যায়—যতক্ষণ না এর পরিণতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। একটি নদী চোখের সামনেই হারিয়ে যেতে পারে। একটি জলাধার দৃশ্যত সংকুচিত হয়ে যেতে পারে। অথচ মাটির নিচে থাকা কোনো জলস্তর (aquifer) বছরের পর বছর ধরে নিঃশেষিত হতে থাকলেও তা জনদৃষ্টিতে সেভাবে ধরা পড়ে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভূগর্ভস্থ জল সম্পদের আরও উন্নত পর্যবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন
হবে। 

জল নিরাপত্তা মানেই জ্বালানি নিরাপত্তা। জল ও জ্বালানি একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িত। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রপাতি ঠান্ডা রাখার জন্য জলের প্রয়োজন হতে পারে। জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সরাসরি নদীর প্রবাহ ও জলাধারের জলের স্তরের ওপর নির্ভরশীল। জল পাম্প করা, শোধন করা, পরিবহন ও বিতরণের জন্য জ্বালানির প্রয়োজন হয়। এর ফলে যে পারস্পরিক সম্পর্কের সৃষ্টি হয়, তাকে অনেক সময় ‘জল -জ্বালানি সংযোগ’ (water-energy nexus) হিসেবে অভিহিত করা হয়। একটি ব্যবস্থার কোনো বিঘ্ন অন্য ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। খরা জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে। জ্বালানির ঘাটতি জল শোধন ও পাম্প করার কাজকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। জ্বালানি অবকাঠামোর দ্রুত সম্প্রসারণ স্থানীয় জলের উৎসের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিভিন্ন দেশ যখন পরিচ্ছন্ন শক্তি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন এই পারস্পরিক সম্পর্কগুলো বোঝা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। একটি সম্পদের সমস্যা সমাধান করতে গিয়ে অন্য একটি সমস্যার সৃষ্টি করার মাধ্যমে টেকসই অবস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়। জল-সংক্রান্ত নিরাপত্তা, অভিবাসন ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে প্রভাবিত করে। জলের অভাব বা নিরাপত্তাহীনতা শেষ পর্যন্ত মানবিক নিরাপত্তারও একটি বিষয় হয়ে উঠতে পারে। খরা, কৃষিজ উৎপাদন হ্রাস, পরিবেশের অবক্ষয় কিংবা বারবার বন্যার কারণে যখন জীবিকা নির্বাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে, তখন মানুষ উন্নত সুযোগের সন্ধানে স্থানান্তরিত হতে পারে। অভিবাসন খুব কম ক্ষেত্রেই কেবল একটি একক কারণে ঘটে থাকে। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, সংঘাত, শাসনব্যবস্থা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক চাপ—এসব কিছুই এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে পরিবেশগত চাপ, বিদ্যমান দুর্বলতাগুলোকে আরও বাড়িয়ে তোলে। জল নিয়ে প্রতিযোগিতা বিভিন্ন জনগোষ্ঠী, কৃষি ও শিল্প খাত এবং শহরের মধ্যে উত্তেজনাও তীব্র করে তোলে।। এর অর্থ এই নয় যে, জলের অভাব হলেই অনিবার্যভাবে সংঘাতের সৃষ্টি হবে। অনেক ক্ষেত্রে, যৌথভাবে ব্যবহৃত জলের উৎস সহযোগিতা ও কূটনীতিকে উৎসাহিত করতে পারে। ঠিক এ কারণেই কার্যকর জল ব্যবস্থাপনা বা শাসনব্যবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সামনে কেবল অনিবার্য সংঘাত কিংবা অফুরন্ত প্রাচুর্যের মধ্যে কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন নেই। সমাজ এমন সব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারে যা সহযোগিতা, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ ব্যবস্থাপনাকে উৎসাহিত করে।

পরবর্তী প্রজন্মের জন্য প্রয়োজন হবে জল বিষয়ক এক ​​ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি। কয়েক দশক ধরে অনেক সমাজই জলকে মূলত এমন একটি পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে আসছে—যাকে আহরণ, শোধন, বিতরণ ও ব্যবহার করা হয়। সেই পদ্ধতিটি বজায় রাখা ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। আরও টেকসই বা স্থিতিস্থাপক একটি পদ্ধতিতে জলকে একই সাথে অর্থনৈতিক সম্পদ এবং একটি বাস্তুতন্ত্র—উভয় হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। নদীর জন্য প্রয়োজন সচল বাস্তুতন্ত্র। জলাভূমি প্রাকৃতিকভাবে জলের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং বিভিন্ন প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। বনভূমি জলাধার অববাহিকা বা ওয়াটারশেডকে প্রভাবিত করে। মাটি জল ধরে রাখে। প্লাবনভূমি অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের জল ধারণ করতে পারে। এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থাগুলোকে ধ্বংস করার ফলে এমন সব পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে, যার মাশুল শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে দিতে হয়। প্রকৃতি জল ব্যবস্থাপনার সাথে যুক্ত কোনো বাড়তি সাজসজ্জা নয়; বরং এটি সেই অবকাঠামোরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
ঠিক এই জায়গাতেই অববাহিকা পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ, বর্জ্য জলের পুনর্ব্যবহার, দক্ষ সেচ ব্যবস্থা, ভূগর্ভস্থ জলের স্তর পুনর্ভরণ এবং প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে বন্যা ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলো ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রযুক্তি সহায়তা করবে, তবে তা একা আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। তবে ভবিষ্যৎ জল নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। উন্নত সেন্সর নজরদারি ব্যবস্থাকে আরও উন্নত করে তুলবে । উপগ্রহ-ভিত্তিক ব্যবস্থা জলের উৎসের পরিবর্তন ও পর্যবেক্ষণে সহায়তা করতে পারে। স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা কৃষিক্ষেত্রে ক্ষতি কমাতে পারে। বর্জ্য জলের উন্নত শোধন প্রক্রিয়া এর পুনর্ব্যবহারকে আরও নিরাপদ করে তুলতে পারে। উপযুক্ত উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জল বিশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অতিরিক্ত জলের জোগান নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ছাড়াও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পূর্বাভাস প্রদান, অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা এবং জলের চাহিদা-বিষয়ক পরিকল্পনার উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে প্রযুক্তি সুশাসনের বিকল্প নয়। একটি অত্যাধুনিক জল-পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ঘাটতি পূরণ করতে পারে না। একটি লবণাক্ততা দূরীকরণ কেন্দ্র (desalination plant) মিঠা জলের সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। একটি নতুন পাইপলাইন দূষণের উৎসস্থলকে ঠিক করতে পারে না। জলের ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে সফল কৌশলগুলো হবে এমন, যেখানে প্রযুক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ সুরক্ষা, বিনিয়োগ এবং জনগণের অংশগ্রহণ—এসবের সমন্বয় ঘটবে। সহনশীলতার স্বরূপ নির্ধারণ করবে "জল - নিরাপত্তা"। পরবর্তী প্রজন্ম সম্ভবত এমন এক পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে, যেখানে কোনো সমাজের সহনশীলতা বা ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা আংশিকভাবে পরিমাপ করা হবে তারা কতটা কার্যকরভাবে জল ব্যবস্থাপনা করছে, তার ওপর ভিত্তি করে।

একটি স্থিতিস্থাপক শহরে শুধু বড় আকারের নিষ্কাশন নালা থাকলেই চলবে না। এটি বৃষ্টির জল ব্যবস্থাপনা করবে, জলাভূমি রক্ষা করবে, দূষণ কমাবে, বর্জ্য জল পুনর্ব্যবহার করবে এবং পরিবর্তনশীল জলবায়ু পরিস্থিতি অনুযায়ী অবকাঠামোর নকশা করবে। একটি স্থিতিস্থাপক কৃষি ব্যবস্থা শুধু আরও বেশি সেচ প্রকল্প তৈরি করবে না। এটি মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার উন্নতি করবে, উপযুক্ত ফসল নির্বাচন করবে, জলের অপচয় কমাবে এবং পরিবর্তিত বৃষ্টিপাতের ধরনের সাথে খাপ খাইয়ে নেবে। একটি স্থিতিস্থাপক দেশ শুধু আরও বেশি ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করবে না। এটি তার ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলো সম্পর্কে জানবে, পুনঃপূরণ অঞ্চলগুলো রক্ষা করবে এবং উত্তোলন নিয়ন্ত্রণ করবে। মৌলিক পরিবর্তনটি হলো জল সংকটের প্রতিক্রিয়া জানানোর পরিবর্তে তা আগে থেকে অনুমান করার দিকে যাওয়া।
ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজ আমরা জল নিয়ে কী করছি তার ওপর। জলের নিরাপত্তা কেবল কোনো একটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন বা আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না। বরং সরকার, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, কৃষক, শহর এবং প্রতিটি পরিবারের নেওয়া হাজার হাজার সিদ্ধান্তের ওপরই তা নির্ভর করবে। আমরা কোন জলাভূমিগুলো রক্ষা করব? কোন নদীগুলোকে আমরা দূষিত অবস্থায় থাকতে দেব? আমরা কতটা ভূগর্ভস্থ জল উত্তোলন করব? কৃষিকাজে আমরা কতটা দক্ষতার সাথে জল ব্যবহার করব? শহরগুলো কীভাবে বৃষ্টির জল ব্যবস্থাপনা করবে? শিল্পকারখানাগুলো কীভাবে জলের  ব্যবহার ও দূষণ কমাবে?
আর সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিরাপদ জলের প্রাপ্তিকে কি কেবলই একটি গৌণ বিষয় হিসেবে না দেখে মানব উন্নয়নের একটি মৌলিক উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তরের ফলাফল পরবর্তী প্রজন্মকেই ভোগ করতে হবে। জল কেবল পান করার কোনো বস্তু নয়; আধুনিক সমাজ যা কিছু উৎপাদন ও ভোগ করে এবং যার ওপর নির্ভর করে—তার প্রায় সবকিছুর সঙ্গেই জল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জল আমাদের খাদ্য উৎপাদনে সহায়তা করে, অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, বাস্তুতন্ত্র টিকিয়ে রাখে, শহরের জীবনযাত্রা সচল রাখে এবং জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। এ কারণেই পরিবেশ বিষয়ক আলোচনার প্রান্তিক পর্যায় থেকে সরে এসে উন্নয়ন পরিকল্পনার কেন্দ্রবিন্দুতে ‘জল নিরাপত্তা’র বিষয়টি উঠে আসা প্রয়োজন। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য জলের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জটি কেবল আরও বেশি জল খুঁজে বের করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।আমরা শিখব কীভাবে আমাদের কাছে থাকা জলের সাথে বুদ্ধিদীপ্তভাবে জীবনযাপন করা যায়। আর শেষ পর্যন্ত এটিই হয়তো নির্ধারণ করবে যে আমাদের শহর, অর্থনীতি, বাস্তুতন্ত্র এবং সমাজ কতটা সহনশীল হয়ে উঠবে।

------------

               ধৃতি বন্দ্যোপাধ্যায়
লেখিকা -- প্রধান শিক্ষিকা, চুঁচুড়া বালিকা বাণী মন্দির উচ্চ মাধ্যমিক।

---------------------------------------------------------------------------------------

"সভ্যতার সংকট --- সত্যজিতের চলচিত্রায়নে" -- সুব্রত রায়


           জিনিয়াস এর আধুনিকতম সংজ্ঞা আমাদের জানিয়ে দিয়েছে যে,তাঁকে হতে হবে যেকোনো একটি বা দুটি বিষয়ে প্রশ্নাতীত রূপে পারদর্শী এবং সেই সঙ্গে একাধিক বিষয়ে গবেষকের মতো কৌতূহলী।অর্থাৎ তাঁকে হতে হবে দ্য ভিঞ্চি,মাইকেলাঞ্জলো,গ্যেটে,আইজেন্সটাইন,রবীন্দ্রনাথ,পিকাসো,ককতো প্রমুখের বংশধর।সত্যজিৎ রায় নিঃসন্দেহে তাই।

'পথের পাঁচালী'তে যখন অপু পাঠশালা যাওয়ার জন্য চোখ মেললো আমাদের সিনেমা দেখার চোখ ফুটলো।তিনিই পথপ্রদর্শক।তিনিই প্রথম প্রতীক শস্যে,রৌদ্রে,সিন্ধুর উৎসবে চলচিত্রের অধিকার বর্ণনা করে গেলেন।ছবিতে সুন্দর  অসুন্দরের টানাপোড়েনের ফলেই জীবনের বাস্তব রূপ আরও প্রকট হয়ে ওঠে।সুন্দরকে আরো সুন্দর লাগে।জন্মের আনন্দ মনে আরো দোলা দেয়।।মৃত্যুর বেদনা মর্মান্তিক হয়ে বাজে।ইন্দির ঠাকুরনের গালভাঙ্গা হাসি সমস্ত মানুষকে মুহূর্তে আপন করে নেয়।পরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক বলেন,"ইন্দির ঠাকুরন এই ছবিতে গ্রাম বাংলার আত্মার প্রতিমা।এখনো ভাবলে এক একটি দৃশ্য আমাকে তাড়া করে ফেরে"।সে সব তো আমাদের চলচিত্রের গতিপথ আমূল বদলে দেয় এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই।কিন্তু যে বিষয়টি ভাবতে গেলে আজও আমি বিস্মিত হই যখন দেখি এই ছবিতে কোনোরকম শ্রমিক--মালিক বা জমিদার---চাষির সংঘর্ষ দেখানো হয় না।তাও কি এমন ঘটে যে রায় পরিবার গ্রাম থেকে শহরে চলে আসতে বাধ্য হয়।এভাবেই তাঁর ছবিতে রাজনীতি এসেছে,তা কখনো অন্যভাবে আবার 'প্রতিদ্বন্দ্বী'বা "সীমাবদ্ধ"তে সরাসরি।

'পথের পাঁচালী' দেখানোর তৎকালীন ভারত সরকারের কি প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সে বিষয়ে উৎপল দত্ত তার "সত্যজিৎ রায় ভারতীয় রেনেসাঁসের ফসল"এই নিবন্ধে তাঁর অসামান্য বক্তব্য আমাদের মুগ্ধ করবেই।"ভারত সরকারের সর্বপ্রধান ব্যাক্তিটি কলকাতায় ছবিটি দেখেছিলেন এবং দেখেই তাঁর মুখ আরক্তিম হয়ে যায়।কিছুটা উত্তেজিত স্বরে তিনি সত্যজিৎ রায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন,সেলুলয়েডে এভাবে দারিদ্র দেখালে কি বিশ্বের কাছে ভারতের দুর্নাম হবে না?এ হলো এক প্রকৃষ্ট ভারতীয় প্রশ্নের নমুনা যা সব ভারতীয় শাসকই বিশ্বাস করেন।সত্যজিৎ রায়ের উত্তর তৎক্ষণাৎ সেই সর্বপ্রধান ব্যক্তিটির মাথা নিচু করে দিয়েছিল।সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন দারিদ্রকে বজায় রাখা যদি আপনার পক্ষে দুর্ণামের না হয়,তবে আমি দেখলে দুর্ণামের হবে কেন?"একইভাবে সত্যজিৎ তাঁর একাধিক ছবিতে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য রেখেছেন চলচ্চিত্রের ভাষায়,যা কখনো শ্লোগান হয়ে যায়নি।কাহিনীর মধ্যে দিয়েই তা তিনি ব্যক্ত করেছেন।এছাড়াও সমাজের প্রান্তিক মানুষের কথাও তিনি তাঁর ছবিতে অত্যন্ত মর্যাদার সঙ্গে বলেছেন।প্রখ্যাত চলচিত্র তাত্বিক আন্দ্রে বাঁজার চলচিত্র তত্বের বইয়ের নাম ছিল,"what is cinema".সেখানে তিনি চলচিত্র সম্পর্কে কিছু বেসিক প্রশ্নের অবতারণা করেন।সত্যজিৎ রায়ও তাঁর ছবির মধ্যে দিয়ে ধর্মীয় কুসংস্কারের বিরুদ্ধে আর প্রান্তিক মানুষের সমাজে কি অবস্থান সে বিষয়ে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেছেন,যা আমাদের আজও ভাবাচ্ছে।

"সদগতি"ছবিটি তৈরী করা হয়েছিল কেবলমাত্র টেলিভিশনের জন্যই।ভারতীয় টেলিভিশনকে যারা নিয়ন্ত্রন করে সেই দুর্নীতিপরায়ণ  গোষ্ঠীর হাস্যকর আচরণের সঙ্গে আমরা সকলেই ভালোভাবে পরিচিত।যেহেতু তাঁদের কর্তাব্যক্তিরা অনেক দেরিতে বুঝলেন যে সত্যজিৎ রায় হলেন,"ভারতীয় রেনেসাঁসের শেষ প্রতিনিধি"সেহেতু তাদের নিজেদেরও টনক নড়লো।এঁরা "সদগতি"ছবিটির প্রদর্শন বন্ধ করতে চেয়েছিলেন,কারন এই ছবিতে "চামার"শব্দটি বারে বারে ব্যবহৃত হয়েছে।লক্ষ্য করুন "সদগতি"ছবিটি তৈরি করা হয়েছিল কেবলমাত্র টেলিভিশনের জন্যই।সুতরাং সংলাপকে চ্যালেঞ্জ করায় সত্যজিৎ রায় ও লেখক মুন্সি প্রেমচন্দ দুজনের ওপরেই আক্রমন করা।

সদগতি দেখার সময় মনেই পড়ে না যে এর মধ্যে সিনেমা শিল্পের কোনো কৌশল আছে।অত্যন্ত সহজ সরল বর্ণনাভঙ্গিতে শুরু হয় কাহিনী।একটি সাধারণ গ্রীষ্মের সকাল,আলো তখনও প্রখর হয়নি।এ সময় মানুষের গলার আওয়াজ নরম থাকে এবং ভুরু কুঁচকে যায় না।দুখী চামারের কিশোরী মেয়ে ধনিয়া উঠোনে ঝাঁট দিচ্ছে।আজ তার জীবনের বিশেষ একটি দিন।আজ পন্ডিতমশাই তাদের বাড়িতে আসবেন,তিনি ধনিয়ার বিয়ের শুভদিন ঠিক করে দেবেন।তাঁর মা ঝুরিয়ার মুখেও খুশি মাখা ব্যস্ততা।পন্ডিতমশাই এর মতন একজন বিশিষ্ট ব্যাক্তিকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে আসা হবে,সেজন্য আলাদা ব্যাবস্থা করতে হবে তো।একটি নিষ্পাপ লাবণ্যময়ী কিশোরী মেয়ের বিবাহের প্রস্তাবনা দিয়ে শুরু।এর চেয়ে চমৎকার বিষয় আর কি হতে পারে।যতই গরীব হোক বা ছোটজাতের হোক,সেই মুহুর্তে ওরা একটি সুখী পরিবার।

প্রথম সমস্যা দেখা দেয় পন্ডিত এলে বসবেন কোথায়?ওরা তো অস্পৃশ্য।ওদের বাড়ির কোনো জিনিসে তো তিনি বসবেন না।একমাত্র কৈশোরের সারল্য এর উত্তরটি জানে।কেন,মোড়লের কাছ থেকে তাঁর খাটিয়াটি ধার করে আনলে হয় না?তখন এই কিশোরী মেয়েটিকে এই কঠোর সত্য শিক্ষা দেওয়া হয় যে খাটিয়া তো দূরের কথা মোড়ল তাদের একটুকরো জ্বলন্ত কয়লাও ধার দেবেন না।বরং মহুয়া গাছের পাতা ছিঁড়ে এনে টাটকা আসন বানানো হোক।পন্ডিত এলে তাঁকে উপঢৌকন দিতে হবে নিয়মমতো।এক সের আটা,আধ সের চাল,এক পোয়া ডাল,আধ পোয়া ঘি আর নুন হলুদ।এসব জোগাড় করে রাখতে হবে।তবে ঝুরিয়া যেন ওসব না ছোঁয়।কোনো জলচল মহিলাকে অনুরোধ করে তাকে দিয়ে আনিয়ে সাজিয়ে রাখতে হবে।আর রাখতে হবে চার আনা পয়সা।একমাত্র হরিজনদের পয়সাটাই পন্ডিতদের কাছে অস্পৃশ্য নয়।

সকাল থেকে কিছু খায়নি দুখী চামার।তাতে কি হয়েছে,এই তো এখুনি সে পন্ডিত কে নিয়ে আসবে।তারপর শুভ কাজটা ভালোয় ভালোয় মিটে গেলে তারপর সে খাওয়ার অনেক সময় পাবে।ঘাসের বোঝাটি মাথায় করে সে টলমলে পায়ে এগিয়ে যায়।পুরো কাহিনীটি আর সবিস্তারে বলার প্রয়োজন নেই।সকালের এই নরম ভাবটা কেটে গিয়ে ক্রমশ কর্কশ দুপুর আসে,তারপর ম্লান সন্ধ্যা ও দমবন্ধকর রাত্রি।দুখী চামারের মৃত্যু,তার মৃতদেহ সরানোর সমস্যা ও সমাধান নিয়েই "সদগতি"।

আপাতত মনে হয় চলচ্চিত্রকার একটি জীবনকাহিনী নির্লিপ্ত ভাবে বর্ণনা করে গেছেন।শুধু নির্লিপ্ত নয়,নির্মমও।সত্যজিৎ রায় তাঁর কোনো ছবিতে এমন হননি।প্রকৃতির কোনো স্থান নেই এখানে,জীবনের প্রবহমানতার কোনো চিহ্ন নেই এখানে।কেউ কেউ বলেন সত্যজিতের বাস্তবধর্মী ছবিতেও কবিত্বের ভাব বেশি থাকে।আমি মনে করি সেটাই মহৎ শিল্পীর প্রকৃত লক্ষণ,যেমন টলস্টয়ের উপন্যাস।কিন্তু সত্যজিৎ সেটাকে অভিযোগ মনে করে এবারে  সদগতির ক্ষেত্রে বললেন দেখো কিভাবে রূঢ় বাস্তবকেই চলচিত্রের ভাষায় উপস্থাপিত করা যায়।

অন্যান্য সব কাজ সেরে ফেলার পর পরিচালক যখন দুখী চামারকে বিশাল প্রাচীন গাছের গুড়িটার সামনে দাঁড় করান তখন আমরা  আঁৎকে উঠি।পন্ডিতের বাড়ির সামনে রাবনের মূর্তি,কিন্তু ক্যামেরা দিয়ে তিনি কখনোই সেটার প্রতি বিশেষ মনোযোগ আরোপ করেন না।পন্ডিতের বাড়িতে সবকিছুই খুব ধীর গতিতে চলে।তার পাশেই দুখী কাঠ চেরাইয়ের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যায়।সে ঘাস কাটতে জানে,কিন্তু সে কাঠ কাটতে জানে না।সে যে কিছু খায়নি সেটা তীব্র মর্মান্তিক ভাবে মনে করিয়ে দেওয়া হয় পন্ডিত ও তার গৃহিণীর আলোচনায়:ওকে কিছু খেতে দিলে হয় না?কিন্তু ওরা চামার,অনেক না খেলে ওদের পেট ভরে না।একটা দুটো রুটির বেশি নেই।সুতরাং তা আর ওকে দিয়ে কি হবে?এই ভেবে পন্ডিত ও গৃহিণী বিবেককে ঘুম পাড়িয়ে নিজেরা শুতে চলে যায়।একটা সময় দুখী চামারের কুড়োলে আলো ও ছায়ার সাংঘাতিক খেলা দেখে শিহরণ জাগে।বোঝা যায় চলচ্চিত্রের ভাষা কত কম সময়ে কত বেশি কথা প্রকাশ করতে পারে।

'সদগতি'র কাহিনী রচিত হয়েছিল কুড়ির দশকের পটভূমিকায়।আজও যে এ ঘটনা কত সত্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না।এ ছবিতে সত্যজিৎ রায় কোনো উচ্চারিত প্রতিবাদ কিংবা নিজস্ব বক্তব্য রাখেননি।কিন্তু তাঁর পরিষ্কার শিল্পভাষা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদের সংবিধান,গণতন্ত্র নিয়ে চেঁচামেচি এখনও কত অসার ।মানুষই মানুষকে বাঁচতে দেয় না।এই হলো এ পর্যন্ত ভারতের ইতিহাস,যা আজও অপরিবর্তনীয়।

সত্যজিৎ রায় নিজের সমসাময়িক জীবনকে তুলে ধরতে গিয়ে রেনেসাঁসের মতাদর্শকেও ছাড়িয়ে গেছেন।যেমন "সদগতি"।সম্ভবত ভারতীয় চলচ্চিত্রে এই প্রথম আমরা দেখতে পেলাম এক শ্রমজীবী মানুষের যন্ত্রনা জর্জর মুখচ্ছবি।আমরা এতদিন ভারতীয় সর্বহারাকে দেখতে পেয়েছি শ্লোগান দেওয়া ইউনিয়ন কর্মী হিসাবে।তারা সকলের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে অমিতাভ বচ্চনের আশায়,যে নিজের ঘুষির আঘাতে কুপোকাত করবে শোষকদের।মূলধারার ছবি বারবার শ্রমিকদের দেখিয়ে এসেছে মধ্যবিত্ত হিসাবে,যারা অপেক্ষা করছে এক পরিত্রতার জন্য।সেই পরিত্রাতা আসবে এবং তাদের মুক্ত করবে।"সদগতি"হলো প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র যা এক প্রকৃত ভারতীয় শ্রমিককে তুলে ধরলো।এই শ্রমিক দুভাবে শোষিত।প্রকৃত পক্ষে "সদগতি"হলো বর্তমান ভারতীয় সর্বহারা আন্দোলনের প্রাক ইতিহাস যা শুরু হয়েছিল ব্রাম্ভনদের ঘৃণা ও ঔদ্ধত্বের পরিবেশে।"সদগতি"ছবির সত্যজিৎ রায় অবশ্যই একজন রেনেসাঁস চিন্তাবিদ নন,বরং সমসাময়িক বিশ্ব যে শ্রেণী সংগ্রামের মুখোমুখি হচ্ছে তারই এক কবি সত্যজিৎ রায়।

পথের পাঁচালী ছবিতে সত্যজিৎ রায় দেখিয়েছেন,তার ছবির চরিত্রগুলি কষ্টভোগ করেছে ভগবানের ইচ্ছায় নয়,বরং মানুষেরই সৃষ্ট দারিদ্রের কারনে।ভগবানের থেকেও ক্ষমতাশালী এক শক্তি তাদের ভিটে থেকে উচ্ছেদ করেছে----এই শক্তি হলো এক সামাজিক ব্যাবস্থা যা শোষনকে ক্ষমা করে।

মনুষত্ব ধ্বংসকারী এই "ঈশ্বর"ধারণার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের চিত্র সাফল্যের সঙ্গে ধরা পড়েছে "দেবী"চলচ্চিত্রে।সেখানে একটি মেয়েকে দেখানো হয়েছে,সে এক সাধারণ গৃহবধূ,ঘোষণা করা হয় সে দেবীর অবতার এবং সমস্ত অসুস্থ গ্রামবাসীকে সুস্থ করে তুলতে পারে।শেষে যে শিশুটিকে সে প্রানের থেকেও বেশি ভালোবাসে সে মুমূর্ষু হলে তার পায়ের সামনে হাজির করানো হয়,যদি সে সেই ছেলেটিকে সুস্থ করে তুলতে পারে।কিন্তু মেয়েটি শিশুটির জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে সাহস পেল না।এবং সে পালাতে চেষ্টা করে।তার শাড়ি শতছিন্ন হয়ে যায় এবং কাজলের কালিতে মুখ আচ্ছন্ন হয়ে যায়।

এ ছবি থেকে এদেশের সিনেমা মেশিন থেকে উদ্ভূত কয়েক ডজন ছবির তুলনা করা যেতে পারে।সেই সব ছবিতে দেখা যাবে একটি মুমূর্ষু শিশুকে দেবী মূর্তির সামনে রাখা আছে।চিকিৎসা বিজ্ঞান তাকে মরবে বলে জানিয়ে দিয়েছে।এবং এরপরেই অবশ্য দেবীর ভজনা করে এক লম্বা গান হবে।সেই দেবী সন্তোষী মা হতে পারেন অথবা স্থানীয় পর্যায়ের কোনো ভুলে যাওয়া দেবতা হতে পারেন।এরপর দেখা যাবে সেই পাথরের মূর্তি একটু হাসতে শুরু করলো,শিশুটির দেহের ওপর কয়েকটি ফুল ছড়িয়ে পড়লো।তারপর আহা সে কি দৃশ্য।সেরা ডাক্তাররা যা পারেননি,এক টুকরো পাথর তা করে দিল কয়েক সেকেন্ডে, শিশুটি চোখ মেলে চাইলো এবং উঠেও বসলো।এরপর ভগবানকে ধন্যবাদ জানিয়ে আরো একটি গান,যা শেষ হতে চায় না অথবা শিশুটির বাবা-মা আনন্দে কৃতজ্ঞতায় মেঝেতে গড়াগড়ি দিতে লাগলো।

এই ধরনের নির্লজ্জ কুসংস্কার প্রতি বছর একের পর এক ছবিতে দেখানো হয়।এগুলি কি ড্রাগসের থেকে কম বিপদজনক?যদি ড্রাগস আমাদের তরুণ প্রজন্মের শরীর নষ্ট করে থাকে তবে এইসব চলচ্চিত্র নষ্ট করে থাকে তাদের মনকে।এইসব বাজে ছবি তৈরি করা যদি অসম্ভব করে তোলা যায় এবং তার পরিবর্তে যদি সারা দেশে কম দামে "দেবী" দেখানোর ব্যাবস্থা করা যায় তবেই সত্যজিৎ রায়ের প্রতি যথার্থ শ্রদ্ধা দেখানো হবে।

ভারতীয় প্রেক্ষাপটে বিচার করলে "দেবী"একটি বিপ্লবী চলচিত্র।শত শত বছরে ভারতীয় গ্রামগুলির প্রত্যন্ত অঞ্চলে ধৰ্মকে যেভাবে মেনে আসা হয়েছে,এই ছবিতে সেই ধর্মকে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে।এদেশে ধৰ্মশাস্ত্র বল কথিত সেই তন্ত্রমন্ত্রকে সরাসরি আঘাত এনেছে।রামায়ন ও মহাভারতের কদর্য প্রযোজনা না দেখিয়ে ভারতীয় টেলিভিশনের উচিত ছিল "দেবী'বারে বারে দেখানো।তাহলে হয়তো অযোধ্যায় হনুমান বাহিনীর কীর্তিকলাপ দেখতে হতো না।গোড়ায় সত্যজিৎ রায় ভেবেছিলেন মহাভারতের পাশা খেলার দৃশ্য নিয়ে একটি বড় বাজেটের ছবি করবেন।তাতে তোশিরে মিফুনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেতারা থাকবেন।তিনি এজন্য ভারত সরকারের কাছে অর্থ চেয়েছিলেন।আমলাতন্ত্র সে আবেদন প্রত্যাখ্যান করে।কারন তখন তারা আটেনবরোর "গান্ধী"ছবির জন্য কোটি কোটি টাকা জলে দিতে প্রস্তুত ছিলেন,যে ছবিতে তিনি ভারতে ইংরেজ শাসকদের সম্পর্কে অভিযোগগুলি স্খলন করতে দুঃসাহসী প্রয়াস নিয়েছিলেন।

আমরা তাঁর শেষ দিককার ছবিগুলি বিশ্লেষগ করে দেখতে পারি।তাহলে দেখবো তাঁর অসাধারণ সমসাময়িক মনে একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে।ইবসেনের "এনিমি অফ দ্য পিপল"অবলম্বনে তৈরি "গণশত্রু"ছবিটি ইবসেনের নাটকের মতো শেষ হয়নি।সেখানে ড: স্টকম্যান সমগ্র বিশ্বের বিরুদ্ধে একা দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছেন যে ব্যক্তি মানুষই সবসময় সঠিক এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ সব সময়ই ভুল।

গণশত্রু একাধিক কারনে,একেবারে নতুন সত্যজিৎ।তিনি এর আগে কখনোই নাটক থেকে ছবি করেন নি।বিদেশি গল্প নিয়েও কাজ করেননি এর আগে।এবং এই ধরনের বিষয় বা চরিত্র তাঁর ছবিতে আগে কখনও আসেনি।এতগুলো নতুন চ্যালেঞ্জের ছবিতে তাঁর স্টাইল এতটাই পাল্টেছে যে আমাদের বিস্মিত হতে হয়।তাই গণশত্রু নতুন সত্যজিৎ তো বটেই।মহৎ শিল্পী বারে বারে নিজেকে ভাঙেন,এক অন্য মাত্রাতে নিয়ে যেতে চান।এক্ষত্রেও তাই।তার বিষয় নির্বাচন ও বলার ভঙ্গি দুটোই বেশ অভিনব।প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে দীর্ঘ সংলাপ--প্রবন দৃশ্যের দাবিতে সত্যজিৎ এ ছবিতে এমনভাবে এত ক্লোজ আপ ব্যবহার করেছেন যা আগে তাঁর ছবিতে দেখেছি বলে মনে হয় না।ক্যামেরার শ্লথগতি,দৃশ্যের অন্তর্মুখীতা এবং দীর্ঘ ক্লোজ আপ ----এই ত্রিমাত্রা থেকে উঠে এসেছে "গনশত্রু"র নতুন শৈলী।

ইবসেনের নাটকে শুধু দূষিত পানীয় জলের কথা আছে।সেই দূষিত জল তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেছে এমন একটি জায়গায় সেটিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পরিণত করে গড়ে উঠেছে একটি অসৎ,দায়িত্বজ্ঞানহীন বাণিজ্যচক্র।এই বাণিজ্যচক্রের বিরুদ্ধে এক ডাক্তারের একক যুদ্ধ এবং অন্তিম পরাজয় নিয়েই ইবসেনের নাটক।সামাজিক মূল্যবোধ,অবক্ষয়,অর্থনৈতিক প্রেক্ষিত---এইসব কিছু ইবসেনের নাটকের মধ্যে বহু পরতে জড়িয়ে ফেললেও ধর্মীয় সংস্কার,বিশ্বাসকে টেনে আনতে পারেননি।সত্যজিৎ সেই সাহস দেখিয়েছেন।তিনি এদেশের সামাজিক,মানবিক অবক্ষয়ের সঙ্গে যেভাবে প্রচ্ছন্ন ধর্মীয় সংস্কারকে বুনে দিয়েছেন,যেভাবে আমাদের বিজ্ঞান বিমুখ অজ্ঞতাকে তুলে ধরেছেন,এই অজ্ঞতার কারন হিসাবে,তাতে হিন্দু মনের অবগহন স্তরের ভূমিকাটি সাহসী উচ্চারণ পেয়ে গেছে নিঃসন্দেহে।এবং এই উচ্চারণই সত্যজিতের ছবিটিকে নিয়ে গেছে এমন এক উত্তরণের বিন্দুতে যেখানে ইবসেন পৌঁছতে পারেননি তাঁর নাটকে।

এরপর আপনি যদি শাখাপ্রশাখার দিকে তাকান তাহলে সেখানে দেখতে পাবেন সত্যজিৎ সেখানে মধ্যবিত্ত অনৈতিকতাকে কশাঘাত করেছেন।এই মধ্যবিত্ত এখন পুঁজিবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে অর্থ উপার্জনের জন্য ছুটছে।অথবা "আগন্তুক"এ দেখুন,সেখানে সত্যজিৎ রায় তথাকথিত সভ্যতাকে ভৎর্সনা করেছেন,যে সভ্যতা বোতাম টিপে একটা শহর ধ্বংস করে দিতে পারে এবং যে সভ্যতা আদিবাসীদের অবজ্ঞা ও ঘৃনা করে।কারন তারা খুন করার শিল্পটি আয়ত্ত করতে পারেনি।

মূল্যবোধের সংকট ঘুরে ফিরে সত্যজিৎ রায়ের অনেক ছবিতেই প্রধান বিষয় হিসাবে উপস্থিত হয়েছে।"শাখাপ্রশাখা"তেও বিষয়টি ফিরে এলো।প্রতিতুলনায় বিশেষ করে মনে পড়ে "সীমাবদ্ধ" ছবির কথা এবং পিকু।"শাখাপ্রশাখা"র গল্প তাঁর নিজের।এতে একটি জিনিস স্বত:প্রমাণিত----সমাজ,জীবন সম্পর্কে তাঁর ধ্যানধারনায়,অনুভবে প্রতিক্রিয়াগুলি তীব্রতর হয়ে উঠেছে।সমাজ মনস্ক শিল্পী সত্যজিৎ আরো বেশি উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন।এটাই স্বাভাবিক।

ছবির শেষ দিকে মানসিক ভারসাম্যহীন মেজোছেলে প্রশান্ত স্বগতোক্তির মতো বলে,"যত সহজ,তত ভালো"এই কথার লক্ষে সত্যজিৎ যেন এই ছবিটিকে পৌঁছে দিতে চান।সহজ অথচ গভীর,এ এমন এক সরলতা যা প্রজ্ঞার গভীরতা থেকে জন্ম নেয়।শাখাপ্রশাখায় সব কিছুর আয়োজন থাকলেও আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত অপূর্ন থেকে যায়।

সত্যজিৎ রায় তার সৃষ্টিপর্বের গোড়া থেকেই উদ্বুদ্ধ ছিলেন মানুষের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থায়।বিষয়বস্তু ও শিল্পরীতিতে সেই ভঙ্গি গোড়া থেকেই লক্ষনীয়।তার বিশ্বাস প্রথম চিড় ধরেছিল "জনঅরণ্য"তে।তারপর শাখাপ্রশাখা পর্যন্ত প্রায় সব ছবিতেই কাজ করেছে সত্যজিতের কঠোর দৃষ্টিভঙ্গি।সমাজের সমালোচনায় তিনি অনেক সময়ই সোচ্চার,কিছুটা সরলীকরনের ছাপও পড়েছে তাঁর এই ধরনের ছবিগুলিতে।কিন্তু তাঁর তীর্যক দৃষ্টি ও বিশ্লেষনের নিষ্ঠুরতা আমাদের চোখ এড়ায়নি।

সত্যজিতের শেষ ছবি "আগন্তুক"এ আমরা দেখি সেই মানবিক বিশ্বাসের প্রত্যাবর্তন।তীব্র  শ্লেষ ও কশাঘাত এখানেও আছে,কিন্তু তারপরেই এক ক্ষমাসুন্দর প্রশান্তির প্রলেপ।ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র মনমোহন যখন পঁয়ত্রিশ বছর পর ঘরে ফেরেন,তখন তাকে দেখে মনে হয় অন্য গ্রহের মানুষ।পৃথিবীতে এসে নানা অসঙ্গতি দেখে মজা পাচ্ছেন,ঠাট্টা করছেন।কিন্তু সমাপ্তিতে নতুন করে অনুভব করেছেন আত্মিক বন্ধন।কিংবা তিনি যেন সেই আলতামিরার গুহাচিত্রকর।তাঁর সারল্য আর আদিমতা নিয়ে উপস্থিত আজকের জগতে।ভঙ্গির এই বৈচিত্রে "আগন্তুক"যেন এক আধুনিক রূপকথার স্তরে উন্নীত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ যেমন তাঁর শেষ জীবনে "সভ্যতার সংকট" লিখেছিলেন,সত্যজিতও তাঁর শেষ ছবিতে সভ্যতার প্রতি তাঁর অনাস্থাকেই দৃঢ় ভাবে ব্যক্ত করেছেন।কখনো কখনো এই ছবির মূল চরিত্র মনমোহনকে আমার সত্যজিৎ রায়েরই "অল্টার ইগো"বলে মনে হয়।ওই একই প্রজ্ঞা,বাগবৈদগ্ধ ও মেধার দ্যুতি।"আগন্তুক"ছবির মূল চরিত্র ছবিতে সভ্যতা,অসভ্য,বর্বর মানুষ,ধর্ম প্রভৃতি সম্বন্ধে যা বলেছেন তাতে একটা কথা পরিস্কার মনে হয় সত্যজিৎ জীবনের উপান্তে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথের মতোই এই সভ্যতা,দৈনিক পত্রিকা,আদিবাসী সমাজ সংস্কৃতি,বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি সম্পর্কে একধরনের মন্তব্য করেছেন চলচ্চিত্রের ভাষায় যা আমাদের বিস্মিত করে,মুগ্ধ  করে আর নতুন চিন্তার খোরাক জোগায়।তাই একথা বলাই যায় রেনেসাঁস শব্দটি সত্যজিৎ রায়ের পক্ষে যথেষ্ট নয়।তিনি ছিলেন মানব জাতির বিবেকের একটি মুহূর্ত।


----------------




             লেখক -- সুব্রত রায় 

---------------------------------------------------------------------------------------






Saturday, 18 February 2023

লড়াই -- শংকর রায়


 লড়াই টা জাত নিয়ে নয়, 
লড়াই টা ভাত নিয়ে হোক। 
লড়াই টা বাবরি নিয়ে নয়, 
লড়াই টা চাকরি নিয়ে হোক। 
লড়াই টা ধর্ম নিয়ে নয়, 
লড়াই টা কর্ম নিয়ে হোক। 
লড়াই টা কতির উপর নয় , 
লড়াই টা ক্ষেতির উপর হোক। 
 লড়াই টা অস্ত্র নিয়ে নয়। 
লড়াই টা শান্তি নিয়ে হোক। 
 লড়াই টা শ্মাসান বা কবরস্থান নিয়ে নয়, 
লড়াই টা বাসস্থান নিয়ে হোক।
 লড়াই টা গরুর উপর নয়, 
লড়াই টা গুরুর উপর হোক ।  
লড়াই টা ব্যয় এর নয়, 
লড়াই টা ন্যায় এর হোক।


 © শংকর রায় 
বিশেষভাবে সক্ষম 
( হেমতাবাদ, উত্তর দিনাজপুর,  পশ্চিমবঙ্গ,  ভারতবর্ষ)  

Sunday, 18 December 2022

সিঞ্চিত - রাণু সরকার


কি জানি কবে বাতাসে ভর দিয়ে 
সুষুপ্ত জীবাণু গুলো উড়ে উড়ে এসে 
বসে ছিলো আমার খোলা জানালায় 
এক বসন্তের গোধূলি বেলায়!
হয়তো তার চেতনায় নেই আর-
উজান স্রোতে টেনেছিলো গুণ অবসরে!

ভালো তো বাসেনি, 
প্রতিদিন গোধূলি বেলায় চলতো সময় কাটানোর খেলা খেলা পালা!
মন্থর গতিতে জীবাণুরা আয়ত্তাধীন হলো
সে এক ফাগুনে প্রবল উচ্ছ্বাসে 
নেচেছিলো প্রাণ তার প্রশ্রয়ে!

ছিলো তো মৃদুভাষী অমৃতবারি সিঞ্চনে!
অতিশয় করুণাময়ী, অ-খেয়ালে হয়তো করেছিলো অঙ্গে ধারণ!
পাঁজরের হাড় গুলো ভেঙে একাধিক খণ্ডে হলো বিভক্ত!

হবে কি নির্মুলন?
হবেনা বাঁধা আর নিবিড় আঁধারে!

Sunday, 27 November 2022

মানবতার উন্মেষ ও জনসেবা - শক্তি সেন




আজিকার দুর্দিনে তবু ভালো লাগছে
দিকে দিকে মানবতা দেখি আজ জাগছে।
প্রাকৃতিক দূর্যোগ কিংবা মারণ ভাইরাসের জন্যে
স্বেচ্ছা সেবীরা এগিয়ে আসছে সেবিতে অন্যে।
গতকাল - ই দেখলুম কত লোক পথে পথে যাচ্ছে
বিলি হচ্ছে তৈরি খাবার ,মানুষেরা খাচ্ছে।
বিয়ে বা ' ভূজনা ' র খরচ বাঁচিয়ে কেউ কেউ নিরন্নকে দিচ্ছে
খোদা বা ঈশ্বরের আশীষ তারা অজান্তেই নিচ্ছে।
শ্রাদ্ধবাড়ি বা বিবাহ বার্ষিকীর খরচও কেউ কেউ বাঁচাছে
মানবতা মনে ঢুকে দেখি অনেককেই নাচাচ্ছে ।
মানবতা থামোনা তুমি,তাল ধরো তাক ধিন
নিরন্ন দুঃস্থ যেন সেবা পায় দিন দিন ।
সরকার বাহাদুর সেও সদা জনগণে সেবা দিতে ব্যস্ত
নানান দায়িত্ব ভিন্নে তারা করেছে যে ন্যস্ত।
আমফান - ইয়াস ঝড়ে আস্তানা উড়ে গেছে যাহাদের
ত্রাণ - রেশনে দুয়ারে কর্মসূচি বানিয়ে সেবা দেয় তাহাদের।
অনেকে রাজনীতিতে নামে জনগণে সেবিতে
কেউ কেউ না দেয় কান জনগণের সোচ্চার দাবীতে।
দেশ,রাজ্য বা জেলায় আরও বেশি সেবকের দরকার
প্রয়োজনে সেবা পাবে, খবর না রাখলেও চরকার।
সমস্যা বিষ ফোঁড়ার মতো ব্যথা করে টনটন
দেশের সম্পদ সমভাবে হচ্ছে না বন্টন।
দিকে দিকে অর্থ শিকারীরা টাকার পাহাড় জমাচ্ছে
সাধারণ কে দুঃখ দুর্দশার পথে টেনে নামাচ্ছে।
কর্পোরেটে যথেচ্ছ টাকা ঢালে সরকার বাহাদুর
দুঃস্থ কৃষককে সাহায্য দিতে কেটে যায় তাদের সুর।
কোভিড টীকা বন্টনেও আজ রাজনীতি চলছে
সকলে পাচ্ছে না টীকা , কেউ কেউ বলছে।
আমরা জনগন চাইছি সবে যেন টীকা পায়
না কেউ দুর্ভোগে ভুগে যারা আজ সেবা চায়।