Tuesday, 20 October 2026

ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো : এক অবিস্মরণীয় প্রস্থান ---- সুব্রত রায়


ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো মারা যান 21 শে অক্টোবর 1984।শুধু সমুদ্রের স্বর, অন্য কোন শব্দ নেই।শুধু সমুদ্রের গন্ধ,অন্য কোন স্পর্শ নেই।আমাদের আর্ত দিগন্তরেখা জুড়ে বেজে ওঠে একটি বালকের হাহাকার ও পদধ্বনি।তারপর চরাচরের মৃদুতম অনুনয়ও থেমে গেল যখন মোমের মতো জ্বলে ওঠে হৃদয়,কবিতা জননের স্বাদ পায়।বাস্তবিক তিনি আজ যখন মৃত্যুর গ্রীবার আড়ালে ওষ্ঠ রেখে স্বয়ং নির্বাক তখন বলা যায় ত্রুফো ছিলেন আমাদের মলিন সায়াহ্নের সবচেয়ে আনন্দময় অতিথি।তাঁর চিত্রনাট্যে ধর্মবিশ্বাসের মতো ইন্দ্রিয়ঘন একটি শুদ্ধতার রং ছিল ও প্যারিস তাঁর প্রিয় শহরের পথে ও উদ্যানে ক্যামেরা সঞ্চালনে সেই আভা যা নিদ্রা ও কুসুমে আকর্ন থাকে।

নবতরঙ্গে তাঁর প্রধান সহযোগী জ্য লুক গোদারের সঙ্গে যদি তুলনা করি তবে দেখবো গোদারে যেখানে ধ্বংসের যন্ত্রণা ও উৎক্ষেপ,ত্রুফোতে সেখানে শৃঙ্খলা ও রেখার সংহতি।আমৃত্যু আমাদের আলোচ্য শিল্পী জানতেন চলচ্চিত্র নামক শিল্প মাধ্যমটির অস্তিত্ব তাঁকে কৃতকর্মের সূত্রে প্রমান করে যেতে হবে।অন্তর্ঘাতকের ভূমিকা তাঁর নয়।একজন আধুনিক শিল্পী যদি তার প্রকাশ মাধ্যমটিকে অখন্ড মন্ডলাকার নিয়ত সত্য বলে ভেবে থাকেন তবে তা রক্ষণশীল রুচিরই পরিচয় বহন করে।"ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ" ছবিতে অন্ততঃ ত্রুফো সুযোগ পেয়েছিলেন নিজেকে নিজের দিনলিপিতে অস্ত্রপচার করার।পরিবর্তে পেলাম মুগ্ধতার মায়া আবরণ।বুঝতে পারি সন্দেহের অধিকারকে এই শিল্পী প্রতিস্থাপিত করতে চান আচ্ছন্নতার দ্বারা।এক নিবিড় আস্তিক্যবোধ ত্রুফোর শিল্পকর্মের জরায়ু।আস্তিক্যতাই তাঁকে রক্ষা করে উৎকেন্দ্রিকতা থেকে।তাঁর প্রধান গৌরব এই যে চলতি শতকের দ্বিতীয় ভাগ ইতিবাচনের জন্য যে নৈতিক দর্প প্রয়োজন তা তাঁর ছিল আর জয়ের এই শিখর থেকেই ত্রুফোর পরাভবের সূচনা

প্রখর অনুশীলনে তিনি যে সৌন্দর্যের জন্ম দেন তা আমাদের ক্লান্ত করে না।সিনেমার খাতায় দুর্বিনীত পুরুষটি যখন সিনেমার পর্দায় নমনীয় হয়ে দেখা দেন,তখন ভালো লাগে কিন্তু এত সহজে, এত অনায়াসে ভালো লাগে যে আহত হৃদয়ে মেনে নিতে হয় যে এ এক বিপর্যয়ের সঞ্চারপথ।অতীতের প্রতি আমরা ঈষৎ মনোনিবেশ করলে আমরা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করবো জর "আর্টস "পত্রিকার যে উড
উদ্ধত সমালোচক অবলীলায় বাতিল করে দেন জনৈক প্রাচ্যদেশীয় চলচ্চিত্রস্রষ্টার "পথের পাঁচালি"কিংবা বিদ্বেষ পরায়ন হয়ে ওঠেন জন ফোর্ডের প্রতি,তিনিই অনতিকাল পরে পরেই নির্মাণ করেন "ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ"যা অবিশ্বে অভিনন্দিত, কিন্তু কোন ক্রমেই প্রচলিত নন্দনতত্বের আততায়ী নয়।

ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো নবতরঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ পরিচালকদের একজন।"লা পলিতিক দেশ অথর"অর্থাৎ লেখক নীতি তত্বের যিনি প্রচার করেছিলেন নিজের অনেক ছবিতেও তিনি তা প্রয়োগ করেছেন।তাঁর সমস্ত ছবির চিত্রনাট্যের লেখক বা সহ লেখক তিনি নিজে।কম খরচে ছবি করার সপক্ষে অনেক কথা বলেছেন ত্রুফো, যেহেতু পরীক্ষা নিরীক্ষা করা তাতে কম বিপদজনক।তাঁর প্রথ ছবি "ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ"(1969)মাত্র আড়াই লক্ষ্য ফ্র্যা তে করা।জ্য লুক গদারের "ব্রেথলেস"ছবিটির মূল আইডিয়া টি ত্রুফোর।এছাড়া "ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ"ছবিটির কান-এ পুরস্কারপ্রাপ্তি ও " জুল এন্ড জিম"(1961)ছবির সাফল্য নবতরঙ্গকে আন্তর্জাতিক পাদপ্রদীপের সামনে এনেছিল।প্রকৃতপক্ষে ত্রুফোর প্রথন তিনটি ছবি "ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ"(1959),"শুট দ্য পিয়ানো প্লেয়ার"(1960),"জুলস এন্ড জিম"(1962)র কাহিনী সম্পাদনা প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিশ্রমী পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য ত্রুফোর শ্রেষ্ঠ ছবি বলা যায়।

এই নিবন্ধের উদেশ্য নয় ত্রুফোর অবমূল্যায়ন।তাঁর নির্মাণ সাফল্য নিয়েও আমার কোন সংশয় নেই,তথাপি হুজুগপরায়ন শোকপ্রস্তাব লিখনেও যেহেতু নিযুক্ত নই, তাই অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে আমাকে যোগ করতে হবে যে ত্রুফোর শিল্পী জীবনের ইতিহাস মূলত কাইয়ে দ্যূ সিনেমার নন্দনতত্ব থেকে এক সফল পশ্চাদপসরনের ধারাবিবরণী।

প্রসঙ্গত "ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ"(1969),"স্টলেন কিসেস"(1968) ও "বেড এন্ড রোসেস"(1970) এই তিনটি ট্রিলজি বলা যায়।আত্মজীবনীমূলক কাহিনীর নায়ক আতোয়া এবং চরিত্রের রূপকার জ্য পিয়ের লিউড একই সূত্রে গাঁথা।কাইয়ে দ্যূ সিনেমার আর্টস এর পাতায় যে সংগ্রাম পরিচালিত হচ্ছিল তার প্রত্যক্ষ পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে 1948 সালে প্রকাশিত ঔপন্যাসিক ও চলচ্চিত্রকার আলেক্সান্ডার আস্ট্রুকের একটি প্রবন্ধে।আসত্রুকের কামনা ছিল চলচ্চিত্রের একটি সার্বভৌম আখ্যায়।অতঃপর আন্দ্রে বাঁজার মানসপুত্র ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো বিশেষ ভাবে অর্জন করলেন মিজ-অন-সিন এর নৈতিক বাস্তবতা ও ডিপফোকাস তত্বের উত্তরাধিকার।

1959 সালে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র প্রানতি জানালো ফ্রাঁন্সকে।ত্রুফো কান থেকে গ্রা প্রি জয় করলেন।অন্যদিকে আলারেনে জ্য লুক গদার দই বিপরীত মুখী প্রতিভা সম্ভব কিরলেন "হিরোশিমা মনআমুর"ও "ব্রেথলেস"এর মতো স্থায়ী শিল্পের সৃজন।কিন্তু যেভাবে "ফোর হান্ড্রেড ব্লোজ "ছবিটির বন্দনা গাওয়া হয়েছে আজ পর্যন্ত নানা দিক থেকে, যেভাবে তা কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছে যে অন্য কোন স্তব নিরর্থক মনে হয় । ছবিটি মোটেই পরীক্ষামূলক বা বেপরোয়া নয়।কিন্তু কেন এমন হল?একজন বিপ্লবী বুদ্ধিজীবী কেন প্রথম অবির্ভাবেই আপসরফা করে বসলেন।অথচ প্রায় একই সময়ে বানানো "ব্রেথলেস" ও "হিরোশিমা মনআমুর"অনেক বেশি উচ্চাশা পরায়ন।গদার তাঁর প্রথম ছবিতেই দেখালেন গল্প বলার নিটোল দায় আর তার নেই,উন্মোচিত হল জাম্প কাটের রাজসিক মহিমা।ত্রুফোর বিরুদ্ধে মুখ্য অভিযোগ  এই যে তাঁর ছবিতে কোন বিকৃতি বা অতিরঞ্জন নেই।প্রায় সর্বত্র তা বাস্তবের সমানুপাতিক।"ফোর হান্দ্রেড ব্লোজ"এ চরিত্র চিত্রনে অনুপুঙ্খ নিষ্ঠা এবং গীতিকবিতার অসামান্য স্পর্শ দর্শককে বিব্রত বা চিন্তিত করে না।পরিবর্তে গঠিত হয় এক পেলব আত্মজীবনী।এঁকে দেয় মায়াজাল।

যেহেতু রক্তে ও মর্মে তিনি শিল্পী, জীবনের প্রথম পর্ব থেকেই ত্রুফো নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে চলেছিলেন।নিরাভরণ রক্ত পরীক্ষায় সাড়া না দিয়ে ত্রুফো যে নান্দনিক আবহ গড়ে তুলেছিলেন তা খুব পলকা নয় অবশ্যই, কিন্তু প্রয়ানের আগেই জেনে গিয়েছিলেন কাইয়ে দলের মুখ্য সেনাপতি পদে তিনি আর অধিষ্ঠিত নন।সেই সিংহাসনটি জ্য লুক গোদারের জন্য সংরক্ষিত।